কৃষি ও প্রকৃতি
বেতশিল্পে বৈদেশিক মুদ্রা এবং বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ
৩১ আগস্ট ২০২৬ | ০১:৩৬ রাত
বাংলাদেশের বনজ সম্পদের মধ্যে উল্লেখ করার মতো যে সম্পদ দৃশ্যমান, তার মধ্যে অন্যতম হলো বেতসম্পদ। অবহেলিত এ সম্পদ মানুষের জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বেত দিয়ে তৈরি করা নান্দনিক জিনিসপত্র ড্রয়িংরুম বা শোয়ার ঘরের সৌন্দর্য বিকাশের অন্যতম উপাদান। নানা কারুকাজমণ্ডিত এসব বেতের আসবাবপত্র ও নকশা করা ফার্নিচার সত্যিই আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। রুচিশীল মানুষের জন্য এটি অমূল্য সম্পদ। দেশ-বিদেশের অভিজাত পরিবারে বেতের তৈরি বিভিন্ন শিল্প আজও তার সৌন্দর্য বিকাশের অপরিহার্যতা সগৌরবে জানান দিয়ে যাচ্ছে।
অতীব দুঃখজনক ব্যাপার যে, বিশ্বজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্পের আজ বড় দুর্দিন যাচ্ছে। যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখনো এটি একটি বৃহৎ শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। অথচ এ শিল্পকে সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করলে একদিকে যেমন দরিদ্র মানুষের একটি আয়-রোজগারের পথ বের হতো; ঠিক তেমনই দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিনির্মাণ করতে বেত একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতো। শুধু অবহেলা আর অদূরদর্শিতার কারণে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প আজ মৃতপ্রায় হয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছে। বেতের সম্ভাবনাময় দিকটি লক্ষ্য রেখে আমরা যদি বেতশিল্পকে সামনে নিয়ে আসতে পারি। তবে বেত আমাদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই দেবে না। দেশের একটি উল্লেখযোগ্য বেকার অংশকে আয়ের রাস্তা দেখিয়ে দেবে সন্দেহ নেই। এটি সরকারের আন্তরিকতা ছাড়া মোটেও সম্ভবপর নয়।
বেতের আবাসস্থল
এশিয়ার গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের অধিকাংশ বনেই সাধারণত বেতের উৎপাদন ভালো হয়। এটি বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, জাভা ও সুমাত্রা অঞ্চলের উদ্ভিদ বললেও অত্যুক্তি হবে না। তা ছাড়া বেত ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ভেজা ও জংলা নিচু ভূমিতে প্রচুর জন্মে। মালয়েশীয় ভাষায় বেতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপগোত্রের নাম রতন (rattan) এবং বাংলাদেশেও অনেক এলাকায় তা রতন নামেই পরিচিত। বেতগাছ জঙ্গলাকীর্ণ কাঁটাঝোপ আকারে হয়। আমাদের দেশে সাধারণত ভাটি অঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় বেতগাছ বেশি দেখা যায়। তাছাড়া গ্রামের রাস্তার পাশে, বসতবাড়ির পেছনে, পতিত জমিতে এবং বনে আর্দ্র জায়গায় বেতগাছ বেশি দেখা যায়।
বেতের চাষাবাদ
আমাদের দেশে বেত সাধারণত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য-চট্টগ্রাম, সিলেটের পাহাড় ও নিচু এলাকায় প্রচুর জন্মে। বেতগাছ সাধারণত চিকন, লম্বা, কাঁটাযুক্ত ও খুবই শক্ত হয়। অঙ্গজ ও বীজ উভয় পদ্ধতির মাধ্যমে বেতের বংশবিস্তার বা চাষ করা যেতে পারে। অঙ্গজ চাষে ঊর্ধ্বধাবক ব্যবহৃত হয়। বীজ চাষে বীজতলায় চারা প্রস্তুত করে পরে অন্যত্র রোপণ করা হয়। বীজের শাঁস ফেলে দিয়ে বীজতলার বীজ বপন করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চারা গজায়। এসব চারা ০.৭৫-১ মিটার উঁচু হলে স্থানান্তর করতে হয়। ২-৩ বছরে বেত বড় ঝাড় হয়ে ওঠে, ৭-৮ বছরে তা কাটা যায়। বেত চাষে বেশি যত্ন লাগে না। তবে চারা লাগানোর কিছুদিন পর প্রয়োজনবোধে সেচ ও সামান্য সার দেওয়া যেতে পারে।
বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ছাড়াও হাওরের কিনারে অনেকটা স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে বেতগাছ জন্মে। বেতগাছ সাধারণত বাঁশঝাড়ের মতো ঝাড় বেঁধে ওঠে। একটি চারা থেকে কিছুদিনের মধ্যেই বেত ঘন হয়ে ঝাড়েও পরিণত হয়। অতি অল্প সময়ে বেতগাছ তার পূর্ণতা লাভ করে। চিরসবুজ গাছটি পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় ৪৫ থেকে ৫৫ ফুট এবং কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি লম্বা হয়ে থাকে।
নিরাপত্তা বেষ্টনি
একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরের চারপাশে বেতগাছ লাগানো প্রায় অপরিহার্য ছিল। তখন বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত এসব বেতগাছ বাড়ির সীমানা প্রাচীর হিসেবে বিবেচনায় আনা হতো। চোর, ডাকাত ও শত্রুর অতর্কিত আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বসতভিটার চারদিকে বড় বড় গর্ত করে পানি জমা করে রাখা হতো। আর গর্তের চারদিকে কাঁটাযুক্ত এসব বেতগাছ রোপণ করে দেওয়া হতো। ফলে চোর, ডাকাত, শত্রু ও বিভিন্ন হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে অনেকটা রক্ষা পাওয়া যেত।