বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেট্রোরেলের ২৭ বিয়ারিং প্যাড ক্রিটিক্যাল, ৪৬ পিয়ারে ফাটল রুমিন ফারহানার বক্তব্যে সংসদে উত্তাপ তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নতুন কোনো তথ্য নেই: জয়সোয়াল ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ প্রতিরোধে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘে আস্থা ফেরানো, শান্তি ও রোহিঙ্গা সংকটে গুরুত্ব নতুন সভাপতির
নারী ও শিশু

নারী চালক-হেল্পারে বাসসেবা শুরু হয়েছিল কবে?

২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৩:১৯ দুপুর

photo

দৃষ্টান্ত গড়ে রাজধানীতে চালু হয়েছে বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’। যা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের উদ্যোগে গোলাপি রঙের ‘পিংক বাস’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। এসব বাসের চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। সরকারের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই সার্ভিসের চালক, কন্ডাক্টর ও হেল্পার সবাই হবেন নারী। অর্থাৎ সার্ভিসটি সম্পূর্ণভাবে নারীদের দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে।

প্রাথমিকভাবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ রুটে ১০টি বাস দিয়ে এই সার্ভিস শুরু হচ্ছে। পাশাপাশি বগুড়ায় দুটি ও চট্টগ্রামে দুটিসহ আরও চারটি বাস যুক্ত হবে। যাত্রীচাহিদা বিবেচনায় ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও আছে। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নারী যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষত অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী নারীদের জন্য, নারী চালক-কন্ডাক্টর নিয়োগের মাধ্যমে পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

গণমাধ্যমগুলো একে ‘যুগান্তকারী পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করলেও বাংলাদেশে নারীর গাড়ি চালানোর ধারার সূচনা কিন্তু আজকের নয়। এর শেকড় প্রোথিত প্রায় সাড়ে চার দশক আগে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের একটি সাহসী সিদ্ধান্তে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দশকে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নারীদের সাইকেল ও মোটরগাড়ি চালানো এবং নিরাপত্তাকর্মীসহ নানা অপ্রচলিত পেশায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। যা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৭ সালে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি হয়। সেই বছর ছালেহা বেগম বাংলাদেশে প্রথম নারী গাড়িচালক হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং তাকে গাড়ি চালানো শিখিয়েছিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। অর্থাৎ দেশের প্রথম স্বীকৃত নারী চালক তৈরির কৃতিত্ব সরাসরি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের।

এ উদ্যোগের পেছনে ছিল ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি নারীর ক্ষমতায়নে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই যে প্রতিষ্ঠানেই নতুন নিয়োগ হতো; সেখানে গ্রামীণ অসহায় নারীদের প্রতি তার অগ্রাধিকার থাকত। ফলে এভাবেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালের কর্মীদের প্রায় ৪০ ভাগ নারী হয়ে ওঠেন।

মজার ব্যাপার হলো, সত্তর-আশির দশকের বাংলাদেশে নারীর গাড়ি চালানো ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী ও প্রায় অকল্পনীয় একটি ঘটনা। এই সময়ের বর্ণনায় বলা হয়েছে, সেই দশকে নারীদের সাইকেল ও মোটরগাড়ি চালানো এবং নিরাপত্তাকর্মীর মতো পেশায় যুক্ত করার উদ্যোগ ছিল সমাজের প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ বিপরীত অভিনব ও ব্যতিক্রমী একটি পদক্ষেপ। তৎকালীন গ্রামীণ ও রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় গাড়ি চালানোকে দেখা হতো একচেটিয়াভাবে পুরুষের কাজ হিসেবে; নারীর জন্য প্রকাশ্যে রাস্তায় গাড়ি চালানো ছিল প্রচলিত পর্দাপ্রথা ও লিঙ্গভিত্তিক শ্রম-বিভাজনের ধারণার সরাসরি বিরোধী। এ কারণেই ছালেহা বেগমের মতো একজন নারী যখন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রশিক্ষণে গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে নেন; তখন সেটি সমাজে বিস্ময়, সংশয় ও অনেক ক্ষেত্রে বিরূপ মন্তব্যের জন্ম দেয়, নারীর শালীনতা, নিরাপত্তা ও পারিবারিক মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতো। গাড়ি চালানোর মতো ‘পুরুষালি’ কাজে নারীর সক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হতো।

এই দৃষ্টিভঙ্গি যে নিছক অতীতের বিষয় নয়, তারও প্রমাণ মেলে হালনাগাদ তথ্যে। ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথোরিটির এক কর্মকর্তা সাম্প্রতিক এক আলোচনায় স্বীকার করেছেন, দক্ষ নারী বাসচালকের অভাবের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই এখনো এ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একইভাবে সড়কে দুই চাকার বাহন চালানো নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এখনো অনেকেই মেয়েদের বাইক বা গাড়ি চালানো সহজভাবে নেন না, ফলে নারীদের প্রায়ই হয়রানির শিকার হতে হয়। অর্থাৎ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র যখন সত্তর-আশির দশকে নারীদের গাড়ি চালানো শেখানো শুরু করে; তখন এটি শুধু একটি দক্ষতা-প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ছিল না বরং এটি ছিল একটি প্রথাবিরোধী সামাজিক সাহস। যা সে সময়ের প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।