নারী ও শিশু
আত্মহত্যায় ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা বেশি
৩১ আগস্ট ২০২৬ | ০১:৩২ রাত
শিক্ষার্থীরা নানা কারণে আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নেয়। দেশে ২০২৫ সালে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে স্কুলশিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা বেশি। আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা একটি সংগঠনের সমীক্ষায় এ চিত্র উঠে এসেছে। ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট’ শীর্ষক সমীক্ষার ফল তুলে ধরে সংগঠনটি বলেছে, এ সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং অনেকটাই পারিবারিক কাঠামো, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।
দেশের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে প্রতি বছরের মতো ২০২৫ সালের আত্মহত্যার চিত্র বিশ্লেষণ করেছে সংগঠনটি। ২০২৫ সালে সারাদেশে মোট ৪০৩ জন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য পেয়েছেন তারা। সর্বাধিক আত্মহত্যা সংঘটিত হয়েছে স্কুলপর্যায়ে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ২০২২ সালে ৫৩২ জন শিক্ষার্থী, ২০২৩ সালে ৫১৩ জন শিক্ষার্থী, ২০২৪ সালে ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীর চেয়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার (৫৯%) বেশি।
কেন আত্মহত্যা করছেন? প্রাপ্তবয়স্করা বা অভিভাবক যদি শিক্ষার্থীদের স্বাধীন মতামত শুনতে চান। তাহলে পরিস্থিতিটা কেমন হতে পারে? আজকে যদি শিক্ষার্থীদের বর্তমান বিদ্যালয় বাদ দিয়ে অন্য একটি পছন্দমতো বিদ্যালয় বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে তাদের কতজন বর্তমান বিদ্যালয়ে যাবে? কিংবা তাদের যদি পড়ালেখা বাদ দিয়ে যা ইচ্ছে করতে বলা হয়, কতজন শিক্ষার্থী পড়ালেখা চালিয়ে যাবে? নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের একটি নাটকে দুটো শিশুকে এ ধরনের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। তারা অবশ্য কিছুদিন পরে এই ‘স্বাধীনতা’ চায় না বলে জানিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের পরীক্ষা করা হলে তার ফলাফল কী হতে পারে? কারণ আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় নয়। বিদ্যালয়ের লেখাপড়া তাদের কাছে আনন্দদায়কও নয়। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এমনই হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছে বিদ্যালয়ের অবস্থান।
তার মানে কি এটা হতে পারে, বয়সজনিত কারণে শিক্ষার্থীদের কাছে পড়ালেখাটাই উপভোগ্য নয়? এ সময় তারা গান গাইতে পছন্দ করে, খেলাধুলা করতে পছন্দ করে, দুষ্টুমি করতে পছন্দ করে কিংবা ছবি আঁকতে পছন্দ করে, কিংবা পড়ালেখা করতে চায় না? আজকে যদি সব শিক্ষার্থীকে বলে দেওয়া হয়, কাল থেকে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে বিদ্যালয়ে আসতে হবে না, এলেও ইচ্ছে না হলে পড়ালেখা করতে হবে না বা বিদ্যালয়ে এসে তারা তাদের খুশিমতো গান গাইতে পারবে, খেলাধুলা করতে পারবে, তাহলে নিজ ইচ্ছায় কতজন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করবে? সে ক্ষেত্রে অন্তত ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীরও যদি পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ দেখা যায়, তাহলেও সেটি হবে বিরাট খুশির খবর। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এতটা আশাবাদী হতে দেয় না।
অনেক দেশেই শিশুরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকে। কারণ শুরু থেকেই বিদ্যালয়গুলোকে তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। সেখানে পড়ালেখার জন্য তারা উদগ্রীব থাকে। এই পড়ালেখা তাদের দৈনন্দিন আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীদের কাছে বিদ্যালয় কেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারছে না? কেন পড়ালেখাটা তাদের দৈনন্দিন আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ডের অংশ হচ্ছে না? বর্তমানে যে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বেশি, শিক্ষার্থীর ফলাফল তুলনামূলক ভালো, সে বিদ্যালয়কে আদর্শ ধরে অনেকে তার পরিচালনা পদ্ধতি দেখে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেন। কিন্তু বাধ্যতামূলকভাবে সব শিক্ষার্থীর নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসার সঙ্গে বিদ্যালয় ও পড়ালেখার প্রতি নিজ থেকে আকৃষ্ট হয়ে বিদ্যালয়ে আসার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক জায়গাতেই বেশ সফলতা অর্জন করতে পেরেছে। কিন্ত শিক্ষার গুণগত মান এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়েই রয়ে গেছে। গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সম্প্রতি নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। এসব উদ্যোগের মূল ফোকাসে শিক্ষার্থীরা থাকলেও তাদের চিন্তা-ভাবনা বা মতামত কিন্তু অপ্রতিফলিতই থেকেই যাচ্ছে। যেখানে যাদের কেন্দ্র করে কর্মকাণ্ড আবর্তিত হয়, সেখানে তাদের মতামত থাকে উপেক্ষিত। কী করলে শিশুরা বিদ্যালয়ে যেতে উৎসাহী বা পড়ালেখার প্রতি আগ্রহী হবে, সে সমাধান শিশুদের কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব কি না? তা নিয়ে হয়তো অনেকের দ্বিধা থাকতে পারে। কিন্ত স্বীকার করতেই হবে যে, শিশুরাই সবচেয়ে ভালো জানে কোন কাজ করলে সেটা তাদের কাছে ভালো লাগবে। সেই কাজ বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে হয়তো বড়রা ভাবনা-চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু পড়ালেখার সঙ্গে শিশুদের আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইলে শিশুদের ভাবনা জানার বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে বা তাদের কোনো ভাবনা জানার রেওয়াজ বা আগ্রহ আমাদের নেই। তাই লেখাপড়া করাটাকে যদি সত্যিই জোর-জবরদস্তির কর্মকাণ্ড না বানিয়ে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে বা অভ্যাসে পরিণত করতে চাই, তাহলে তাদের ভাবনা জানার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের শিশুদের, দেশের আগামী ভালো ভবিষ্যৎ চাইলে আমাদের এসব ভেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জনের মধ্যে ১ কোটি ৭১ লাখ ৬০ হাজার ১৭৫ জনই ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী, শতাংশের হিসাবে যা ১০.১০। এরপরই আছে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী, যাদের সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লাখ ৪২ হাজার ৬৮২ জন। শতাংশের হিসাবে ৯.৯২। এই বিশাল সংখ্যক কিশোর-কিশোরীর শিক্ষা, জীবন-দক্ষতা ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করছে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ। কেননা কিশোর-কিশোরীরা সঠিকভাবে বেড়ে উঠলেই দেশ উন্নত হবে। অদম্য গতিতে এগিয়ে যাবে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র। প্রতিটি শিশুকে এমন অনুভূতি দিতে হবে যে সে মূল্যবান, তার কথা শোনার মানুষ আছে এবং কঠিন সময়ে সে একা নয়। যত্নশীল পরিবার, সহানুভূতিশীল শিক্ষক, নিরাপদ বিদ্যালয় এবং সচেতন সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে শিশুদের মানসিক সুস্থতা রক্ষা করা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। যদি কোনো শিশুর মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর হতাশা, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা জীবন নিয়ে নিরাশার মতো লক্ষণ দেখা যায়। তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্য, বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। সময়মতো সহায়তা অনেক সংকট প্রতিরোধ করতে পারে।