ভ্রমণ
হাওরের নীল জলে নিজেকে খোঁজার গল্প
২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৫:০৯ বিকাল
জলরাশি আর পাহাড় দুটিই আমাকে অদ্ভুত এক মায়ায় কাছে ডাকে। তবে সেই প্রকৃতি হতে হবে মানুষের কোলাহল, ভিড় আর ব্যস্ততা মুক্ত। আমি চাই নির্জন, নির্মল, কলহমুক্ত পরিবেশ; যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে নিজের একান্ত কথোপকথনের সুযোগ থাকে। আর সেই নির্জনতার সঙ্গে যদি কয়েকজন কাছের মানুষ থাকে, যাদের কাছে অনায়াসে নিজের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা কিংবা নীরবতাটুকুও ভাগ করে নেওয়া যায়, তাহলে তো কথাই নেই।
এবার তাই আমাদের গন্তব্য—কিশোরগঞ্জের হাওর। সত্যি বলতে, এই যাত্রার সিদ্ধান্তটা ছিল অনেকটাই আকস্মিক। আমরা হাওরে যাব সেটা আগে থেকেই ঠিক ছিল। শুধু কবে যাব তা নিশ্চিত ছিল না। তবে হাওরের সৌন্দর্যকে তার পূর্ণতায় অনুভব করার সমস্ত পরিকল্পনা ছিল আমাদের। হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। আর সিদ্ধান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ট্রেনের টিকিট কেটে ফেলা। খরচও তুলনামূলক কম। যাতায়াতের জন্য ট্রেনই আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল। নিরাপত্তা, স্বস্তি আর ট্রেনযাত্রার নিজস্ব এক ধরনের নস্টালজিয়ার কথা মাথায় রেখেই, এই সিদ্ধান্ত।
কয়দিন থাকব, সেটা নিয়ে অবশ্য খানিকটা দ্বিধা ছিল। তাই ফিরতি টিকিট আর কাটা হলো না। ইচ্ছা ছিল ফেরার সময়ও ট্রেনেই ফিরব। তবে পথের গল্প কখন কোথায় মোড় নেয়, তা তো আগে থেকে বলা যায় না। যাত্রার আগের দিন সবাই একত্র হলাম। ছোটখাটো বৈঠকে বসলাম আমরা। কে কখন কোথা থেকে রওয়ানা হবে, কে কীভাবে স্টেশনে পৌঁছাবে, সঙ্গে কী থাকবে, কোথায় যাব, কোথায় থাকব, সবকিছু নিয়েই চলল পরিকল্পনা। আগের রাতেই ব্যাগ গোছানোর কাজ শেষ করে ফেলেছিলাম। ভ্রমণের আগের রাতের একটা আলাদা উত্তেজনা থাকে, শরীর বিছানায় থাকলেও মন যেন অনেক আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
পরদিন সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আমি বাসা থেকে রওয়ানা দিলাম। ট্রেন ছাড়ার কথা ছিল সাড়ে দশটায় কিন্তু মানুষের পরিকল্পনা আর রেলের পরিকল্পনা যে সব সময় এক হয় না, সেটা আবারও প্রমাণিত হলো। প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট বিলম্বের পর অবশেষে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হলো।
আমিসহ আমরা চারজন। একজন পূর্বপরিচিত আর বাকি দুজনের সঙ্গে পথ চলতে চলতেই গড়ে উঠেছে এক গভীর সম্পর্ক। জীবন কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে কিছু মানুষকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করায়। হয়তো কোনো অদৃশ্য প্রয়োজনে, কোনো অদেখা গল্পের টানে। একসময় সেই মানুষগুলোই জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে। এই তিনজনও তেমনই, এখন তারা শুধু ভ্রমণসঙ্গী নয়, আমার আত্মার মানুষ।
ট্রেন ধীরে ধীরে শহর ছাড়তে শুরু করল। জানালার ওপারে বদলে যেতে লাগল দৃশ্যপট। টঙ্গী পার হওয়ার পর প্রকৃতি যেন তার নিজস্ব রূপ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হলো। শহরের কংক্রিট পেরিয়ে চোখের সামনে একের পর এক সবুজের বিস্তার। মাঠ, গাছপালা, জলাশয়—দুচোখ যেন প্রকৃতির মায়ায় আটকে যেতে লাগল।
দুপুর গড়িয়ে প্রায় একটা নাগাদ আমরা ভৈরব স্টেশনে পৌঁছালাম। সেখানে কিছুক্ষণ বিরতি। নরসিংদীর বিখ্যাত লটকন, লেবু আর পেয়ারা কিনে আবার ট্রেনে উঠলাম। প্রায় পনেরো মিনিটের বিরতির পর ট্রেন আবার ছুটতে শুরু করল কিশোরগঞ্জের দিকে। দুপুর দুইটার দিকে বাজিতপুর স্টেশনে নামলাম। সেখানে আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষা করছিলেন দুজন মানুষ। তারাও আমাদের এই যাত্রা পথের কিছুটা সঙ্গী। স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের আন্তরিক আতিথেয়তা গ্রহণ করলাম। খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম, গন্তব্য মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলি।
বাজিতপুর শহর থেকে ফেরিঘাটের পথে যাওয়ার সময় জহুরুল হক মেডিকেল কলেজ এবং জহুরুল হকের বাড়িটিও অল্প সময়ের জন্য ঘুরে দেখলাম। সময় খুব বেশি ছিল না, তাই বেশিক্ষণ থাকা হলো না। ফেরিঘাট কাছেই হওয়ায় দ্রুত পৌঁছে গেলাম। তারপর শুরু হলো আমাদের প্রকৃত হাওরযাত্রা।
ফেরিঘাট থেকে অষ্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার। বর্ষাকালের হাওর তখন তার পূর্ণ যৌবনে। উত্তাল জলরাশি, বিস্তৃত নীল আকাশ আর চারদিকে পানির অসীম বিস্তার। মনে হচ্ছিল পৃথিবী যেন হঠাৎ তার সমস্ত সীমারেখা মুছে দিয়েছে। হাওরকে সত্যিকার অর্থে দেখতে হলে বর্ষাকালেই আসতে হয়। বছরের অন্য সময়ে যার অস্তিত্ব অনেকটাই আড়ালে থাকে, বর্ষায় সেই হাওর যেন নিজের সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে জেগে ওঠে।
ট্রলার ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। নীল আকাশের প্রতিচ্ছবি স্বচ্ছ পানিতে ফুটে উঠেছে। বাতাসে জলের গন্ধ, চারপাশে অনন্ত জলরাশি, প্রকৃতির এই বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের সমস্ত অহংকার কত ক্ষুদ্র মনে হয়! কিছুক্ষণ পর মনে হলো, আমি আর শুধু হাওর দেখছি না, হাওরের নীল জলের ভেতর দিয়ে যেন আমার নিজের জীবনকেও দেখতে শুরু করেছি।
এই নীলের ভেতর একে একে কত প্রিয়-অপ্রিয় মানুষের মুখ ভেসে উঠল। কত পুরোনো স্মৃতি, কত ভুলে যাওয়া গল্প, কত অসমাপ্ত কথোপকথন। আর সবার আগে মনে পড়ল মায়ের কথা। মা কখনো আমাকে নদীতে গোসল করতে দিতেন না। নৌকায় ওঠাও ছিল অনেকটা নিষিদ্ধ। অথচ পানির প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল ছোটবেলা থেকেই। সুযোগ পেলেই লুকিয়ে নদীতে গোসল করতাম। বিশেষ করে শিলাইদহে গেলে নদীতে না নেমে কখনো ফিরতে পারতাম না।
শৈশব থেকেই একটা ইচ্ছা ছিল, কোনো একদিন অনেক প্রিয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে নদী কিংবা হাওরের পাশে বসব, চারপাশের প্রকৃতি দেখব আর নির্বিঘ্নে গল্প করব। সেই অপূর্ণ ইচ্ছেরই যেন কোনো এক বিকেলের পূর্ণতা ছিল এই যাত্রা। আমার সঙ্গে থাকা মানুষগুলো কেবল সহযাত্রী নয়। তারা আমার আত্মার মানুষ। তাদের সামনে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হয় না। হাসি যেমন ভাগ করে নেওয়া যায়, তেমনি কোনো অকারণ বিষণ্ণতাও নিঃসংকোচে তাদের পাশে রাখা যায়।
এরই মধ্যে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকজন, মোহাম্মদ আলী। পরিচয়ের সময় খুব বেশি পেরোয়নি অথচ অল্প সময়েই মানুষটি যেন আমাদের আপন হয়ে উঠল। আমিসহ আমরা তখন পাঁচজন। সূর্য পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা ছুটে চলেছি গন্তব্যের দিকে। হঠাৎ আকাশের রং বদলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীল আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। তারপর ঝোড়ো বাতাস, সঙ্গে ভারী বৃষ্টি।
আমি বরং বৃষ্টিটা উপভোগ করছিলাম। তবে আমার সহযাত্রীদের চোখেমুখে আমার জন্য বাড়তি উদ্বেগ দেখতে পেলাম। তাদের আশ্বস্ত করে বললাম, আমার বাড়ি পদ্মা আর গড়াই নদীর মাঝখানে। এমন পরিবেশ আমার একেবারে অপরিচিত নয়, নদী আর জলরাশির সঙ্গে আমার পুরোনো পরিচয় আছে। কিছুক্ষণ পর মেঘ কেটে গেল। বৃষ্টি থেমে গেল। আর বৃষ্টির পর হাওর যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠল। প্রকৃতি কখনো কখনো নিজের সৌন্দর্যকে আরও গভীর করে তুলতে একটু অন্ধকার ডেকে আনে।
সন্ধ্যা নেমে এলো। আমরা তখন অষ্টগ্রামের খুব কাছাকাছি। অবশেষে অষ্টগ্রামে পৌঁছালাম। সেখান থেকে অষ্টগ্রাম জিরো পয়েন্ট হয়ে মিঠামইনের দিকে যাত্রা শুরু হলো। চারদিকে তখন রাতের অন্ধকার। হাওরের বুক চিরে আমাদের রথ ছুটে চলেছে। দূরে দু-একটি মাছ ধরার নৌকা। তাদের ক্ষীণ আলো অন্ধকারের বুকের মধ্যে জোনাকির মতো জ্বলছে। দৃশ্যটা এতটাই মায়াবী ছিল যে সেই সৌন্দর্যের লোভ সামলাতে পারলাম না। মাঝপথেই থেমে গেলাম।
কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। কেউ কেউ গল্পে মেতে উঠল। আরেক সহযাত্রী থাকার বন্দোবস্ত নিয়ে ব্যস্ত। সেই ফাঁকে হাসি-ঠাট্টা, গল্প আর পরিকল্পনা, সব মিলিয়ে আমাদের ভ্রমণটা আরও মায়া ছাড়াতে লাগলো।
অষ্টগ্রাম থেকে মিঠামইনের দূরত্ব প্রায় চৌদ্দ কিলোমিটার। রাতের অন্ধকারে সেই পথটুকু যেন আরও রহস্যময়। চারপাশে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। শুধু জল, আকাশ আর অন্ধকারের ভেতর ছুটে চলা আমাদের রথ। চোখ ফেরানো যায় না। কখন যে মন হাওরের অন্ধকারের ভেতর হারিয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। শৈশব থেকে বর্তমান পর্যন্ত জীবনের কত স্মৃতি যেন একে একে দরজা খুলে বেরিয়ে আসতে লাগল। মনে হলো এতদিন আমি জীবনকে দেখেছি সামনে তাকিয়ে, আজ প্রথমবার যেন পেছন ফিরে নিজের জীবনটাকেও দেখতে পেলাম।
অবশেষে থাকার একটা ব্যবস্থা হলো। হোটেলে ব্যাগ রেখে একটু ফ্রেশ হয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম। এই অঞ্চলের একটা বিষয় আমাদের বেশ অবাক করেছিল, রাত নয়টা পেরোলেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। চারপাশ যেন দ্রুত মানবশূন্য হয়ে পড়ে। কিন্তু আমাদের পেটের ঘড়ি তখনো শহুরে সময়ে চলছিল। তাই রাতের খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম।
দু-একটি হোটেল খোলা ছিল। তবে তারাও বন্ধ করার প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে। ফলে পছন্দমতো খাবার পাওয়ার সুযোগ ছিল না। তারপরও যা পেলাম, তা-ই যেন অসাধারণ মনে হলো। দেশি মাছ, ভাত, রুটি, পরোটা; একেবারে মাটির কাছাকাছি খাবারের স্বাদ। খাওয়া শেষ করে আবার বেরিয়ে পড়লাম হাওরের দিকে।
দুপাশে জল, মাঝখানে আমরা। চারপাশে এমন নীরবতা, যেন পৃথিবী তার সমস্ত শব্দ কোথাও জমা রেখে আমাদের জন্য শুধু নিস্তব্ধতাটুকু রেখে দিয়েছে। এই সময় সহযাত্রী আলী তার বাড়ি থেকে নিয়ে আসা কিছু আখ বের করলেন। আমরা সবাই মিলে অত্যন্ত তৃপ্তি নিয়ে খেলাম। এর ফাঁকে অনেকেই পরিবারের সঙ্গে কথা সেরে নিলো।
রাত আরও গভীর হলো। আকাশে তখন অসংখ্য তারা। মনে হচ্ছিল, পুরো আকাশটাই যেন আমাদের পাঁচজনের জন্য এক বিশাল আলোকমঞ্চ সাজিয়ে বসেছে। এই নির্জনতায় নিজেকে উপলব্ধি করার লোভ সামলাতে পারলাম না। একসময় চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলাম। কতদিন নিজের সঙ্গে এত গভীরভাবে কথা বলা হয়নি, তার কোনো হিসাব নেই। নিজের ভেতরে জমে থাকা অসংখ্য অব্যক্ত শব্দের সঙ্গে সেদিন যেন দীর্ঘ আলাপ হলো।
মনকে বললাম, তুই তোর মতো চল। তোকে আর থামাব না। আর আমি নিশ্চল হয়ে বসে রইলাম। সেই রাতের নির্জনতায় মনে হলো, মানুষ আসলে সারাজীবন বাইরে যা খুঁজে বেড়ায়, তার অনেকটাই তার নিজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। রাত প্রায় শেষের দিকে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি অথচ শরীরে কোনো ক্লান্তি নেই। চোখে ঘুম নেই। হোটেলে ফিরতেই হবে, তবুও মনে হচ্ছিল, এই রাত যদি আরেকটু দীর্ঘ হতো!